বাংলা সাহিত্যে ভ্রমণকাহিনী অনেক লেখা হয়েছে, কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলীর "দেশে-বিদেশে"-র মতো রসালাপ আর পাণ্ডিত্যের সংমিশ্রণ খুব কমই দেখা যায়। ১৯২৭ সালে লেখক যখন অধ্যাপনার কাজে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে পাড়ি জমান, সেই সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত এই বইটি আজও পাঠকদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়। এটি কেবল একটি দেশ ভ্রমণের বর্ণনা নয়, বরং এক অজানা সংস্কৃতিকে চেনার এক জাদুকরী জানালা।
কাহিনী ও প্রেক্ষাপট:
বইটির শুরু হয় লেখকের কোলকাতা থেকে পেশোয়ার হয়ে কাবুল যাত্রার মাধ্যমে। লেখকের বর্ণনায় খাইবার পাস থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের রুক্ষ প্রকৃতির যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা পাঠককে মুহূর্তেই সেই পরিবেশে নিয়ে যায়। কাবুলে পৌঁছানোর পর সেখানকার আমীর আমানুল্লাহর সংস্কারপন্থী শাসন এবং রক্ষণশীল সমাজের যে দ্বন্দ্ব লেখক প্রত্যক্ষ করেছেন, তা বইটিতে ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হয়ে আছে।
কালজয়ী চরিত্র 'আবদুর রহমান':
"দেশে-বিদেশে" বইটির কথা বললে যে চরিত্রটি সবার আগে চোখের সামনে ভাসে, তা হলো লেখকের দীর্ঘকায় ভৃত্য 'আবদুর রহমান'। তার অকৃত্রিম ভালোবাসা, অদ্ভুত আতিথেয়তা এবং রান্নার বর্ণনা বইটিকে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছে। বিশেষ করে আবদুর রহমানের বিশাল খাবারের আয়োজনের বর্ণনা পাঠকদের জিভে জল এনে দেয়। লেখকের সূক্ষ্ম রসবোধ এবং আবদুর রহমানের সরলতার এই রসায়ন পুরো বইটির প্রাণ।
লেখনী শৈলী ও পাণ্ডিত্য:
সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর বহুভাষিক জ্ঞান এবং রসবোধ। তিনি হাসির ছলে এমন সব গূঢ় সত্য কথা বলেন, যা পাঠককে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। ফার্সি কবিতা, উর্দু শের আর ফরাসি দর্শনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি ভ্রমণকাহিনীকে এক দার্শনিক রূপ দিয়েছেন। কাবুলের সেই শীতের রাত, বরফ পড়ার দৃশ্য আর বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডার বর্ণনা পাঠককে মোহিত করে রাখে।
কেন এই বইটি আজীবন প্রাসঙ্গিক?
১. সংস্কৃতি বিনিময়: একটি ভিন্ন জাতির খাদ্যাভ্যাস, পোশাক এবং জীবনধারাকে কত গভীরভাবে ভালোবাসা যায়, তা এই বইটির প্রতিটি পাতায় স্পষ্ট।
২. রসবোধ: মুজতবা আলীর রম্য ধাঁচের বর্ণনা আপনার ক্লান্ত মনকে এক নিমেষে ভালো করে দিতে পারে।
৩. ঐতিহাসিক গুরুত্ব: আফগানিস্তানের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের এক নিরপেক্ষ চিত্র এখানে পাওয়া যায়।
bnebooks-এর পাঠকদের জন্য শেষ কথা:
যদি আপনি ঘরে বসেই সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে আফগানিস্তানের কাবুলিওয়ালাদের দেশে ঘুরে আসতে চান, তবে "দেশে-বিদেশে" আপনার জন্য সেরা পছন্দ। এটি কেবল একটি বই নয়, এটি একটি সফর—যা শেষ করার পর আপনার মনে হবে আপনি নিজেও এক বিশালকায় আবদুর রহমানের আতিথেয়তা গ্রহণ করে ফিরলেন।

